রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্ত কেন্দ্রিক অপ্রতিরোধ্য ইয়াবা পাচারঃপাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ….

শ.ম.গফুর,উখিয়া,কক্সবাজারঃ

কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক অপ্রতিরোধ্য ইয়াবা পাচার।বাড়ছে নানা অপরাধও।প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে বড় বড় চালান। গত সাত দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় ১৩ লাখের বেশী ইয়াবা জব্দ করেছে। এসব ঘটনায় আটক করা হয়েছে অন্তত ৩৯ জনের মতো পাচারকারী। এঁদের বেশির ভাগই মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিক বা রোহিঙ্গা। এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল উদ্বিগ্ন। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ রোহিঙ্গা শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।

জেলার উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপ্রতিরোধ্য ভাবে বাড়ছে ইয়াবা পাচার, ডাকাতি, চুরি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ।
এ সংক্রান্তে গেল চার বছরে মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪টি। যেখানে আসামি ২ হাজার ৬৮৭ জন রোহিঙ্গা। এরপরও আশ্রিত রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।তাদের কারও কারও হাতে উঠে এসেছে আগ্নেয়াস্ত্র। গড়ে তুলছে ছোট ছোট সন্ত্রাসী বাহিনী। সব মিলেয়ে এখন তারা অনেকটা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকা।ইতোমধ্যে তারা খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক পাচার ছাড়াও নানা অপরাধে জড়িয়েছে। যার ফলে ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধের মাত্রা গত চার বছরে চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।২০১৮ সালের ৪ মে থেকে চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই নারীসহ নিহত হয়েছে ১১২ জন রোহিঙ্গা। যা ভাবিয়ে তুলেছে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের।আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১০১৪টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ৬৮৭ জন রোহিঙ্গাকে।যার মধ্যে ৪৩ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত মামলা। বাকি ৫৭ শতাংশ অস্ত্র, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ক্ষমতা আইন, সরকারি কাজে বাধাদান, ডাকাতি, ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যা, মানবপাচার ও নিজেদের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে মারামারি সংক্রান্ত মামলা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭০টি খুনের মামলা হয়েছে গত চার বছরে। এ সময় ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৩৪টি মামলা হয়েছে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অপরাধে। অপহরণ ছাড়াও রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ মাদক ব্যবসায় জড়িত।সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের হাত ধরে আসছে ইয়াবা ও স্বর্ণের বারসহ নানা রকম মাদকদ্রব্য। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২ জন মাদক পাচারকারী গডফাদারের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। মাদকের বড় বড় চালান পাচারে জড়িত তারা। এসব অবৈধ মালামালের কর্তৃত্ব ও ভাগাভাগি নিয়ে ক্যাম্পে মাঝে-মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দায়ের করা ১০১৪ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৬২২ রোহিঙ্গা। আর তদন্ত শেষে ৮৯৪টি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। ওই সময় থেকে চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত চারজন নারীসহ শুধু কক্সবাজার জেলায় বন্দুকযুদ্ধে ২৮৪ জন নিহত হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, দিনদিন ইয়াবা পাচার বাড়ছে। বাড়ছে স্বর্ণ পাচারও।গোপনে সংবাদ না পেলে পাচার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তার পরও হাল ছাড়ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০ থেকে ২৮  আগস্ট পর্যন্ত র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি, এপিবিএন, কোস্টগার্ডের অভিযানে প্রায় ১৩ লাখ ৬০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার উখিয়ার ঘাট কাস্টমস মোড় থেকে কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধীনস্থ ঘুমধুম বিওপির টহল দল সাঈদী আলম(৪৫) নামের এক পাচারকারীকে ৩ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক করে।সাঈদী আলম নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের হেডম্যান পাড়ার মৃত ওয়ারেত আলীর ছেলে।এসময় একটি সিএনজিও জব্দ করা হয়।

একই দিন দিবাগত রাত ৮ টার দিকে বালুখালী দাখিল মাদ্রাসার সামনে থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ও ইয়াবা বিক্রির নগদ ২ লাখ ৮১ হাজার টাকা সহ ৪ মাদক কারবারিকে আটক করেছে কক্সবাজারস্থ র‍্যাব-১৫’র একটি অভিযানিক দল।আটককৃতরা হলো জামতলী রোহিঙ্গা শিবিরের ক্যাম্প-১৫’র সাব ব্লক ডি ৯’র নুর উদ্দিনের ছেলে আসমত উল্লাহ (২৯), কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের ক্যাম্প-২’র ডি ব্লকের মোঃ বাদুর ছেলে মোহাম্মদ রফিক (২৩) ও বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরের ক্যাম্প-৮ এর ব্লক ৫৩ এর মৃত আবু বক্কর ছিদ্দিকের ছেলে মোহাম্মদ কাশিম (৪৩) (রোহিঙ্গা) এবং বালুখালী জুমের ছড়া এলাকার শাহ আলমের ছেলে মিজানুর রহমান (২০)।গ্রেফতারকৃত আসামীদের পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র‍্যাব’র এ কর্মকর্তা।

গত শুক্রবার ভোররাতে টেকনাফের হাবিবছড়া মেরিন ড্রাইভ এলাকা থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার ইয়াবা জব্দ করে কোস্টগার্ড। সংস্থাটির সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা আমিরুল হক জানান, গোপন সংবাদে মেরিন ড্রাইভ সড়কে অভিযান চালিয়ে এই ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। কোস্টগার্ড সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে ইয়াবার বস্তা ফেলে পাচারকারীরা পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা যায়নি। তিনি আরও বলেন, ২০ আগস্ট সেন্টমার্টিনের ছেড়াদ্বীপ থেকে ১৪ হাজার ইয়াবা জব্দ হয়েছিল।একইদিন উখিয়ায় র‍্যাব-বিজিব উদ্ধার করেছে ৪ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা। জব্দ করেছে একটি সিএনজি।আটক হয়েছে ৫ মাদক কারবারি।

২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে ট্রলারে করে আনা ইয়াবার চালান সাগরতীরে খালাসের সময় টেকনাফ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা জব্দ করেন। এ সময় পাচারকারীরা পালিয়ে যান। তবে ট্রলার মালিক মো. হারুন ও মাঝি মো. কামালসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

২২ আগস্ট উখিয়ার বালুখালী এলাকায় মো. সৈয়দ নুরকে ৪০ হাজার ইয়াবাসহ নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়।তবে তাকে ষড়যন্ত্র মুলক ফাঁসিয়েছে বলে পরিবারের দাবী।ওই মামলায় আসামী করা হয়েছে আরও ৪ জনকে।
এরা হলেন পালংখালী ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের হাজী আবদুল মজিদের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম,তার ভাই ইউপি সদস্য বকতার আহমদ,১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মৃত নজির আহমদ চৌধুরীর ছেলে নুরুল আবছার চৌধুরী ও পালংখালীর আনজুমান পাড়ার কলিম উল্লাহর ছেলে আবুল খায়ের।

মানবাধিকার কর্মী নুর মোহাম্মদ শিকদার বলেন, মাদক পাচার নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। রোহিঙ্গা আসাতে  পাচার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদক পাচার ঠেকাতে রাষ্ট্রের আরও কঠোর হওয়া দরকার। না হলে আগামী প্রজন্মকে বাঁচানো কঠিন হবে। উখিয়ার সর্বত্র এখন ইয়াবা আর ইয়াবা।হাত বাড়ালেই মিলছে মরণঘাতি এ ট্যাবলেটের।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আহমেদ সনজুর মোরশেদ বলেন, ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নিয়মিত অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের অপরাধ দমনে সেখানে দায়িত্বরত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি থানা পুলিশের একাধিক টহল দল অভিযান পরিচালনা করে আসছে। রোহিঙ্গাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে পুলিশ আরও কঠোর হবে।

উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সেখানে রোহিঙ্গাদের এমন অপরাধ কর্মকান্ড আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকেও ভাবিয়ে তুলেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সিরাজুল মোস্তফা জানান, চলতি সপ্তাহে বড় বড় ইয়াবা চালান জব্দ করা হয়েছে। আগের চেয়ে পাচার খুব বেড়ে গেছে। এদিকে র‍্যাবের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার ও সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদীর দেওয়া তথ্যমতে, গত সাত দিনে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় র‍্যাবের অভিযানে  প্রায় ২ লাখের বেশি ইয়াবাসহ ১১ জনকে আটক করা হয়।

৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. কামরান হোসেন জানান, কিছুদিন আগে ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে অভিযান চালিয়ে ৪০ হাজার ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। তিনি আরও বলেন, এই ব্যাটালিয়ন ২০২১ সালের শুরুতে শিবিরে নিযুক্ত হয়। তখন থেকে ১১টি রোহিঙ্গা শিবির থেকে প্রায় ৫ লাখ ইয়াবাসহ ১০৭ জনকে আটক করা হয়।

১৪ এপিবিএন অধিনায়ক মো. নাইম উল হক জানান, চলতি সপ্তাহে বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে অভিযান পরিচালনা করে ১০ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ ৭জন আটক হয়েছে।

১৬ এপিবিএন অধিনায়ক এসপি তারিকুল ইসলাম বলেন, গত সাত দিনে ২ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ ৪জনকে আটক করা হয়।

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, জেলায় মাদক ও অপরাধে রোধে অভিযান অব্যাহত আছে।পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ দমনে র‌্যাব প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছে। মাদক পাচারে জড়িত রোহিঙ্গাদের আটক করা হচ্ছে।

২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. ফয়সল হাসান খান জানান, উপজেলার তল্লাশি চৌকিগুলোতে নিয়মিত ইয়াবাসহ পাচারকারীরা আটক হচ্ছে।২০ আগস্ট ৬০ হাজার ইয়াবাসহ টাঙ্গাইলের দুই পাচারকারীকে আটক করা হয়। সিও ফয়সল হাসান খান বলেন, রোহিঙ্গারা আসার পর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ৮৭০ ইয়াবাসহ ১৩২ জন রোহিঙ্গাকে আটক হয়েছেন।

কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি) গত ১ জানুয়ারি ২০২১ হতে অদ্যাবধি পর্যন্ত চোরাচালান ও মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বিজিবি টহলদল কর্তৃক ১০১,০২,৭০,১০০/- (একশত এক কোটি দুই লক্ষ সত্তর হাজার একশত) টাকা মূল্যের ৩৩,৬৭,৫৬৭ পিস বার্মিজ ইয়াবাসহ ১৬১ জন আসামী আটক করে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, প্রতিদিনই বাড়ছে রোহিঙ্গাদের মামলার সংখ্যা। হত্যা, অপহরণ, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২ জন মাদক পাচারকারী গডফাদারের সন্ধান মিলেছে।বড় পাচারকারীদের ছত্রছায়ায় থেকে ক্যাম্পের আরও অনেকেই এ ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। অভিযানে যারা ধরা পড়ছে, তারা তো বহনকারী। আমরা চেষ্টা করছি রোহিঙ্গা গডফাদারদের ধরার।পুলিশ নিয়মিত মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More