বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, একাত্তরে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত গোলাম কবিরের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃৃতি আজও মেলেনি

নীতিশ বড়ুয়া, রামু (কক্সবাজার)
তৎকালীন পাকিস্থান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল রামু থানায় ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। এ মামলায় অভিযুক্তদের তালিকায় ৫ নম্বরে ছিল গোলাম কবির। তৎকালীন রামু থানা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়ায় তাকে এ মামলায় জড়ানো হয়। শুধু তাই নয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে এলাকায় পরিচিত সেই গোলাম কবির স্বাধীনতার ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাননি। কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের মেরংলোয়া গ্রামের মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে গোলাম কবির মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরে লড়াই করেন।
গোলাম কবির বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ২৬ বছর। আমিসহ আমার মতো আরও অনেকে দেশ স্বাধীন করার চিন্তায় বিভোর। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উজ্জ্বীবিত করে। এরপর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য আমরা তৎকালীন এমপি ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে সংগঠিত হই। রামু খিজারী হাই স্কুল মাঠে ট্রেনিং শুরু করি। প্রথমে আনসার কমান্ডার আবদুল হক ও পরে সুবেদার নুর আহমদ আমাদের ট্রেনিং দেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই, ১৯৭১ সালের ১৭ মে আমিসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রামু থানার তৎকালীন ওসি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেন। এ মামলায় ১ নম্বরে ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, ২ নম্বরে প্রফেসর মোশতাক আহমদ, ৩ নম্বরে আফসার কামাল চৌধুরী, ৪ নম্বরে আকতার আহমদ, ৫নং নম্বরে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়। আমাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হওয়ার পর রামু হাই স্কুল মাঠ থেকে ট্রেনিং নেয়ার জন্য আমরা নাইক্ষ্যংছড়ি জুমখোলা পাহাড়ে চলে যাই। সেখানে আমরা প্রায় এক সপ্তাহ ট্রেনিং করি।
যুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করে এই যোদ্ধা বলেন, এপ্রিল মাসের শেষের দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি জুমখোলা এলাকায় একটি কাঠের ব্রীজের পাশে একদল রাজাকার অবস্থান নেয়ার খবর পাই। মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার নুর আহমদের নেতৃত্বে প্রফেসর গোলাম কাদের, আবদুল জব্বার সহ আমারা মুক্তিবাহিনীর ২০/২৫ জন সদস্য জুমখোলা কাঠের ব্রীজ এলাকায় রাজাকার বাহিনীর উপর হামলা করি। পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময় হয়, এক পর্যায়ে রাজাকার বাহিনী পালিয়ে যায়।
মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কবির বলেন, এপ্রিলের মাঝামাঝি ঘটনা, আমাদের কাছে খবর আসে কক্সবাজারের তৎকালীন পুরাতন ঝিনুক মার্কেট সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে পাকিস্থানি যুদ্ধনৌযান অবস্থান নিয়েছে। খবর পেয়ে আমরা ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০/২৫ জন মুক্তিবাহিনী রামু থেকে কক্সবাজার যাই। প্রথমে রাডার ষ্টেশনে গিয়ে, সাগরে অবস্থানরত পাকিস্তানী নৌযানের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি। এ সময় আমরা দূরবীন দিয়েও দেখি। প্রায় ২৫/২৬ মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরে দুইটি যুদ্ধ জাহাজ ভাসমান অবস্থান আমরা দেখতে পাই। প্রায় এক সপ্তাহ অবস্থানের পরে, জাহাজ দুটো ওই স্থান ত্যাগ করে চট্টগ্রামের দিকে চলে যায়।
একাত্তরের ২৯ মার্চ সকালে আমরা কক্সবাজার বিমান বন্দরে গিয়ে রানওয়ে নষ্ট করে দিয়েছি, শত্রুবাহিনীর বিমান যেন কক্সবাজার বিমান বন্দরে নামতে না পারে। ওই দিন পাক বাহিনীর একটি গাড়ি (জিপ) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া পার হয়ে, কক্সবাজারের দিকে আসার খবর পাই। দুপুরে রামু খিজারী হাই স্কুলের সামনে আমরা ব্যারিকেড দিই। বিকাল ৩টার দিকে একটি খোলা জিপ রামু চৌমুহনীতে পৌঁছালে, আমরা গাড়িটি আটকে দিই। এ সময় গাড়িতে সাদা হাফ পেন্ট ও গেঞ্জি পরা চার জন লোক ছিলেন। আমরা ছিলাম ২০/২৫ জন। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আমি লাফ দিয়ে জিপটির ইঞ্জিনের উপরে ওঠে, গাড়ির সামনের সীটে বসা লোকটিকে অস্ত্র তাক করি। মুহূর্তের মধ্যে তারা জয় বাংলার লোক বলে পরিচয় দেন। খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী ঘটনাস্থলে আসেন। পরিচয় পত্র দেখে আমরা নিশ্চিত হলাম, সামনের সীটে বসা লোকটি ছিলেন, মেজর জিয়াউর রহমান, গাড়ি চালাচ্ছেন কর্নেল অলি আহমদ, পিছনের সীটে ছিলেন, ব্রিগেডিয়ার খালেকুজ্জামান ও কর্নেল মীর শওকত। পরে ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী তাদেরকে কক্সবাজার শহর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, দিনটি ঠিক মনে নাই, সম্ভবত মে মাস। রামুর জোয়ারিয়ানালার উত্তর পাশের লাল ব্রীজে রাজাকার বাহিনী পাহারা দিচ্ছিলো। খবর পেয়ে আমরা সেখানে গিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করলে, তারা পালিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন গোলাম কবির-
বঙ্গবন্ধু যতবার রামুতে আসেন অন্য অনেকের সঙ্গে এই গোলাম কবির তাঁর সান্নিধ্যে ছিলেন। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর হিসাবে প্রবীণদের কাছে পরিচিত আওয়ামীলীগের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এই নেতা। যিনি এখনো সেই সময়ের বঙ্গবন্ধুর নানা স্মৃতি আওড়িয়ে বেড়ান এখনো।
“১৯৭৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী, সেদিন ছিল মঙ্গলবার। বিমানে করে বঙ্গবন্ধু কক্সবাজার নেমে প্রথমে সমুদ্র সৈকতে ঝাউচারা রোপন করেন। সেখান থেকে চলে আসেন রামুতে। রামু উপজেলা গেইট থেকে চৌমুহনী স্টেশন পর্যন্ত জলের ফোয়ারা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বেশকিছু গেইটসহ তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য নানা আয়োজন করেছিলাম আমরা। আমরা তাঁর গাড়ির ওপর ফুল ছিঠিয়ে ছিলাম। অনেকটা পুস্পবৃষ্টির মত করে। এরপর সরাসরি তিনি গাড়ি নিয়ে রামু রাবার বাগান চলে যান।” গোলাম কবির বলেন, সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রামু রাবার বাগানে গিয়ে রাবার শিল্পের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ঠদের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। “আগে রাবার বাগানের মাটিতে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত রাবারগুলো সংগ্রহ করা হতোনা। সেদিন তিনি বাগানে ঢুকে বিষয়টি পর্যবেক্ষন করেন এবং একটি গাছের গোড়া থেকে নিজের হাতে পরিত্যক্ত রাবার তুলে নেন। ওই দিনই তিনি ওই পরিত্যক্ত রাবারও সংগ্রহের নির্দেশ দেন। তিনি উদাহরণ স্বরূপ বলেছিলেন, ভাল রাবার বিশটাকা হলে এগুলো অন্তত অর্ধেক দামে তো বেচা যাবে। সেদিন থেকে এখনও পর্যন্ত রামু রাবার বাগানে পরিত্যক্ত রাবারও সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান গোলাম কবির।
গোলাম কবির আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু একই দিন কক্সবাজারের চৌফলদন্ডীতে লবন শিল্পের উন্নয়নে লবনচাষীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এসময় তিনি লবনের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধুর এ সফর নিয়ে পরদিন (১২ ফেব্রুয়ারী ১৭৭৫) জাতীয় পত্রিকা দৈনিকবাংলায় ছবিসহ প্রধান শিরোনাম করেছিল। তারা হেড লাইন দিয়েছে-“ লবন সরবরাহ সুনিশ্চিত করার নির্দেশ” আর সাবহেডিং ছিল- “জরুরী কর্মসূচির মাধ্যমে রাবারে স্বনির্ভর হতে হবে-বঙ্গবন্ধু।”
শুধু দেশের জন্য নয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্যও নিবেদিত প্রাণ ছিলেন গোলাম কবির। তিনি ১৯৬৫ সালে রামু খিজারী হাই স্কুলে অস্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই রামু ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রামু থানা আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক, ১৯৭৮ সালে রামু থানা যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ১৯৮৯ সালে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। একই সময়ে রামু থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একাত্তরে দেশের স্বাধীনতার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামী হয়েছি। সেই সময় দেশ স্বাধীন করতে না পারলে, আমাদের ফাঁসি হতো। কিন্তু দেশের জন্য এত কিছু করার পরও স্বাধীনতার ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাইনি। এ দুঃখ আমার আমরণ থেকে যাবে।
গোলাম কবীর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর সহযোদ্ধা ও রামু উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদ্য বিদায়ী কমান্ডার নুরুল হক। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করতে গিয়ে, গোলাম কবির রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামী হয়েছেন। এ ছাড়াও যুদ্ধকালীন সময়ে তার অবদানের কথা সকল মুক্তিযোদ্ধা অবগত। কিন্তু কি কারণে এত দিন পর্যন্ত সরকারি তালিকায় তাঁর নাম আসেনি, আমার বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০১৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাচাইয়ে তাঁর নাম আমরা মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করেছি।
রামু উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা বলেন, যাচাই-বাচাই সম্পন্ন করে ২০১৭ সালে একটি তালিকা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তিতে সেই তালিকা থেকে তিন জনের নাম (১০ ভাগ) আমরা পূনরায় পাঠিয়ে ছিলাম। বাকিদের নামও তালিকাভূক্ত করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More