ফসলীমাঠে কর্মমুখী নারী চাঙা হচ্ছেঃ গ্রামীন অর্থনীতি

মোঃ ওয়াহেদুজ্জামান, গাইবান্ধা সদর থেকে: এ জগতের যা কিছু সুন্দর চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছ নারী, অর্ধেক তার নর, বাণীঃ জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, উত্তরজনপদের সকল সেক্টরে তথা গাইবান্ধায় নারী শ্রমিকের কদর ও সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর রংপুর বিভাগের আট জেলায় নারী শ্রমিকের কদর অনেক বেশি। মঙ্গা জয়ে এ অঞ্চলের নারীদের ভুমিকা অতুলনিয়।
চাতালের ধান সিদ্ধ করা, শুকানো, ঝাড়া-চালাসহ বস্তা বন্দির কাজে তাদের জুড়ি নেই। চাতালশিল্প ছাড়াও এ উপজেলায় তাঁতশিল্প, মাদুরশিল্প, বাঁশ ও বেত শিল্প, কাচের বোতল তৈরি, গার্মেন্টস কারখানা, নির্মাণ কাজ এবং কৃষি কাজে জড়িত রয়েছেন নারীরা। তাঁতশিল্পে নারীরা নিপুণ হাতে তৈরি করছেন বিভিন্ন নকশা আঁকা চাদর, কম্বল, তোয়ালে, পাপোশ, ওয়ালমেটসহ সুতার তৈরি রকমারি পোশাক।
কৃষি উৎপাদনেও নারী পিছিয়ে নেই। তারা জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, নিড়ানি, এমনকি ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজেও পুরুষ শ্রমিকের সমান অবদান রাখছেন বর্তমানে। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও মহিলাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাটি বেশি গুরুত্ব পায়। নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, উত্তরের নারীরা গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে স্বল্প আয়ের নিম্নবিত্ত পরিবারের নারী গ্রামীণ ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে শ্রম দিয়ে অভাবের সংসারে অনেকটা সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। গৃহবধূরা বাড়িতে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালনসহ সেলাই কাজ করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছেন। সব মিলিয়ে উত্তরাঞ্চলে নারী শ্রমিকের চাহিদা যেমন বাড়ছে তেমনি তাদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে নারী ঘর থেকে বের হতে পারতেন না। এ জন্য নিম্ন আয়ের কৃষক, শ্রমিক ও দিনমজুরদের সংসারে দুইবেলা দু,মুঠো খাবারও জুটত না। এখন বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নারীরা কাজ করে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছেন।ওদের এক সময় বলা হতো অসহায়, অবলা নারী । সন্তান, সংসার ও জীবন বাঁচাতে ওরা হাতে ধরেছে কোদাল। আর মাথায় নিয়েছে মাটির ঝুড়ি। ঘরের বধূ এখন সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে মাটি কেটে বেড়াচ্ছেন। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে, এক সময় মঙ্গা বা অভারের অঞ্চল হিসাবে চিহিৃত ছিল আমাদের জেলাসহ উত্তরঅঞ্চল । সেই মঙ্গা কে জয় করেছে আমাদের অঞ্চলের নারী শ্রমিকরা। ফলে গ্রামীন অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে। জীবন ধারণ, সংসার জীবন, পরিবার-পরিজন নিয়ে চলমান সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পুরুষকে সহযোগিতা করছে। ঘরে-বাইরে সমভাবে এগিয়ে এসেছে নারী। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের কৃষি জমিতে নারীদের কাজ করতে ইদানীং চোখে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র, অভাবি, চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত নারীরা পুরুষের পাশাপাশি মাঠে শ্রম বিক্রি করছে। আমাদের গ্রামীণ সমাজে নারীরা গৃহিণী হিসেবে চার দেয়ালের মাঝে সংসারের কাজকর্ম করে আসছিলেন। সংসারের ব্যয়ভার বহনে পুরুষরা একা পেরে উঠতে না পারায় সম্প্রতি নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে মাঠের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বম্রপুত্র নদীর বুকজুুড়ে কামারজানি বন্দরে জেগে ঊঠেছে হাজার হাজার একর আবাদি জমি। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া জমির মালিকরা ফিরে এসে ওই জমিতে চাষাবাদ শুরু করেছে। বর্তমানে গম, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, বেগুন, ভুট্টা, সরিষা, তিল, বাদামসহ বিভিন্ন জাতের ফসলের সমারহে সবুজে ছেয়ে গেছে চরাঞ্চল। আর ওই সব ফসলি জমিতে পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারী শ্রমিকরা বেশি কাজ করছে। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের ৮০% মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে কৃষিকাজ করে। কৃষিকাজ সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন। মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ তার চারপাশের সামগ্রিক প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচির্ত্যের সঙ্গে সমন্বয় করেই জীবনকে সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দভাবে বেঁচে থাকার জন্য লালন ও ধারণ করে চলেছে। বাংলাদেশে নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এদেশের মাটি উর্বর। আর এই উর্বর মাটিতেই যুগ যুগ ধরে ফসল ফলাচ্ছেন কৃষকেরা। উল্লেখ্য কৃষিকাজে আমাদের দেশের গ্রামীণ নারীর অবদান অনস্বীকার্য।নারীর মাধ্যমেই সূচিত হয় কৃষি সভ্যতা। আমাদের নারী সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই প্রাণবৈচির্ত্য ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে নারীদের অনুশীলন ও পরিশ্রমের মাধ্যমে। কৃষি ক্ষেত্রে স্থানীয় ঐতিহ্য ও জ্ঞানের বাহন হচ্ছে গ্রামীণ নারী সমাজ। বিশেষ করে কৃষি ও বীজ ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, ঘরের বীজ দিয়েই কৃষকরা চাষাবাদে ব্যস্ত। নারী সেই বীজ প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ ছাড়াও ফসল উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণে রাখছে। এছাড়াও ফসল ফলনে অবদান দেশীয় পদ্ধতিতে বহুমুখী শস্য আবাদ, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য গ্রামীণ নারী সমাজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ নারীরা বাড়ির আশপাশের আঙিনায় সবজি উৎপাদন করে থাকে। এছাড়া জৈবসার ব্যবহারের মাধ্যমে জমির স্বাস্থ্য রক্ষা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ অবদান রেখে চলেছে নারীরা।
উৎপাদনকারী ও ভোক্তা এবং কৃষিকাজের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নারী স্থায়ী উন্নয়ন ক্ষেত্রে মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের ভুলেগেলে চলবেনা যে দেশের শতকরা ৮৫ জন বাস করে গ্রামে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিয়েই বাংলাদেশ। তাই কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচাতে হলে পরিবেশ রক্ষায় গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নারীর বেড়ে উঠাতেই যে প্রকৃতির সঙ্গে এক আদর্শিক ও বস্তুগত সম্পর্ক রয়েছে। তথা নারী বৈষম্য দূর হোক।

মতামত দিন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More