উখিয়া-টেকনাফের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে স্থানীয়রা

শ.ম.গফুর,উখিয়া(কক্সবাজার) প্রতিনিধি

স্থানীয়দের কমছে আয়,বাড়ছে ব্যয়।প্রাপ্রি কম,ক্ষতির পরিমাণ বেশী।হারিয়েছে স্বস্থি,বেড়েছে অস্বস্থি।আগে গোলা ভরা ধান ছিল,এখন ঘাটতির মুখে।হারিয়েছে চাষের জমি।হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
পাহাড়, বন প্যারা নিধন।বিপন্ন পরিবেশ।ক্ষেত -খামার নেই।আছে মরুভুমির মত হাহাকার।ঝড় জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় ধ্বসের সম্ভাবনায় আতঁকে ওঠার উপক্রম।এই যেনো সাম্প্রতিক সময়ের চিত্র কক্সবাজারের উখিয়া- টেকনাফের।এসবের মুল রোহিঙ্গা সংকট।

মায়ানমার সেনাদের হাত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মোচন করে দিয়েছিলো সরকার। আর কক্সবাজারের মানুষ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো তাদের হৃদয়। ৭ মাস সময় ধরে রোহিঙ্গা স্রোতের টান লেগেছে কক্সবাজারের আর্থসামাজিক অবস্থার উপরে। রোহিঙ্গাদের কারনে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে স্থানীয়রা। তারাও রোহিঙ্গাদের মতো বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আর রোহিঙ্গাদের চাপে হুমকিতে রয়েছে বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য।
অন্যদিকে আইএনজিওদের বেপরোয়া কর্মকান্ড ও লুটপাটের ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে ভুক্তভোগিরা। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলছে নানা অপরাধমুলক কাজ। প্রতিনিয়ত চলছে পুলিশের অভিযান। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা আতংকের মাঝেই স্থানীয়রা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী বলে মনে করছে কক্সবাজারবাসি।
সরেজমিনে জানাগেছে, সম্প্রতি বিপন্ন রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি কমছে কক্সবাজারের মানুষদের। প্রতিনিয়ত বাড়ছে শুধু অসন্তোষ। গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনারা। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন চালায়। এ থেকে বাঁচতে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গারা। লাখ লাখ রোহিঙ্গা যখন কক্সবাজারে পালিয়ে আসছিল তখন সবার আগে তাদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় স্থানীয়রা। পানি, খাবার ও আশ্রয় দিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলো তারা। এদিকে যে রোহিঙ্গাদে নিয়ে চারপাশজুড়ে অপরাধ কর্মের ভয়, সেই সম্প্রদায়কেই নিজেদের নিরাপত্তা মনে করেছে স্থানীয়রা। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের সমাজ ও অর্থনীতিতে। জিনিসপত্রের দাম স্বাভাবিক থাকছে না। কক্সবাজারে চাকরি ও আয়ের ক্ষেত্রও ছোট হয়ে এসেছে।
সুত্র জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশ ও স্থানীয় জনগণের প্রশংসা করেছিল আন্তজার্তিক সম্প্রদায়। প্রশংসা করেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ীরা। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে। আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে স্থানীয় জনগণের ওপর। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে, কমে গেছে আয়ের উৎস। এখনও ঘৃণা নেই, তবে কিছু অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। গত আগস্টের রোহিঙ্গা ঢলের আগে থেকেই ৩ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে বসবাস করতো। তাদের সবাই মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার। হত্যা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসলে স্থানীয়রা তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের যা আছে তাই দিয়ে বরণ করে নেয়।একাধিক সুত্রে জানাগেছে, কক্সবাজারে বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা শিবির আছে। উখিয়া থেকে লেদা পর্যন্তই অনেকগুলো আশ্রয় শিবির। অনেক নির্মাণ কাজ চলছে সেখানে। তাদের আশ্রয়ে ভবন তোলা হচ্ছে। ফলে বন ও কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু রোহিঙ্গা নয়, সরকারি কর্মকর্তা, ত্রাণকর্মীদের জন্যও জায়গা প্রয়োজন সেখানে। লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ১২১৪ হেক্টর জমি বরাদ্দ দেয় সরকার। যার বেশিরভাগই ছিল বনভূমি। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রকল্পের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা শিবিরের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয়দের স্বাস্থ্য, পানি, জীববৈচিত্র, ভূমি ও বন ২৮ রকম হুমকির মধ্যে পড়েছে।এনিয়ে পালংখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদ আহমদ জানান, বন উজাড় করা হয়েছে। সেখানকার প্রাণীরা বিলুপ্ত হচ্ছে। কৃষিজমিতেও গড়ে তোলা হচ্ছে ভবন। এর সুফল পাচ্ছে গুটিকয়েক মানুষ, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবাই।
এব্যাপারে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর  উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে স্থানীয়দের জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, কক্সবাজারে অনেক পান ও তরমুজ বিক্রি হতো। কিন্তু এখন ব্যবসায়ীরা অন্য জায়গা থেকে কিনে আনছে, কারণ এখানেই চাহিদা অনেক বেশি, দামও বেশি।’ তিনি আরও বলেন, কৃষিজমি বিলুপ্ত হওয়ায় আমরা ফসল ও সবজি কম ফলাতে পারছি। গরু-বাছুরকে ঘাস খাওয়ানোর কোনো জায়গা নেই। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা স্থানীয় শ্রমবাজারে ঝড় তুলেছে। স্থানীয়দের আয়ের উৎস কমে গেছে। তারা মিয়ানমারে ফিরে যাক আর না যাক কক্সবাজার আর আগের মতো হবে না!
কক্সবাজারের শিক্ষাবিদ কাজী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিদ্দিকী, শওকত আলম ও আলমগীর হোসেন জানান, রোহিঙ্গা সংকট স্থানীয়দের জীবনে মারাত্নক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয়রা দেখছে যে তাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, আয় কমে যাচ্ছে, বন ধ্বংস হচ্ছে, কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। তারা আরও বলেন, রোহিঙ্গারা কখনও দেশে ফিরে যাবে কি না তা নিয়েও সন্দিহান রয়েছে। স্থানীয়রা শরণার্থীদের ঘৃণা করে না। আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে অসন্তুষ্টি চলে এসেছে। যদি এ অবস্থা চলতে থাকে তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাবে এমনটাই
আশংকা করছেন নানা শ্রেনীপেশার মানুষ।কবে রোহিঙ্গা সংকটের উত্তরণ পাবে তার সঠিক খবর নেই।ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিয়ে সন্দেহের দানা জমাট হচ্ছে।

মতামত দিন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More